Home » সীমান্তের মাদক পাচারের আগ্রাসন, মূল হোতারা অধরাই

সীমান্তের মাদক পাচারের আগ্রাসন, মূল হোতারা অধরাই

কর্তৃক Mahabobul Haque Polen
নিজস্ব প্রতিবেদক 75 ভিউ
Print Friendly, PDF & Email

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তবর্তী মেহেরপুর জেলা। এখানে যেন মাদক পাচারের নীরব ভয়াবহ এক যুদ্ধ চলছে প্রতিদিন। গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা, হেরোইন আর মদের চালান পেরিয়ে আসছে সীমান্ত দিয়ে। ধরা পড়ছে শুধু খুচরা বিক্রেতা, দরিদ্র দিনমজুর, ইজিবাইকচালক কিংবা পথভ্রষ্ট কিশোররা। অথচ মাদকের মূল হোতারা রয়ে যাচ্ছেন অধরাই, অদৃশ্য এক ছায়াচ্ছন্ন জগতে। গত তিন মাসে র‌্যাব, বিজিবি, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের যৌথ অভিযানে উদ্ধার হয়েছে ৮,৫৬০ বোতল ফেনসিডিল, ৫৫ কেজি গাঁজা, ৮০০ গ্রাম হেরোইন ও ৮৭৬টি ইয়াবা। দায়ের হয়েছে শতাধিক মামলা, গ্রেপ্তার হয়েছেন প্রায় সমসংখ্যক আসামি। তবে এদের বেশির ভাগই বহনকারী ও খুচরা বিক্রেতা।
জাতিসংঘের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ইউএনওডিসি -এর হিসাব বলছে, দেশে যত মাদক বিক্রি হয়, তার মাত্র ১০ শতাংশ ধরা পড়ে। বাকি ৯০ শতাংশ অবাধে ছড়িয়ে পড়ে দেশের অভ্যন্তরে। গত ১ আগস্ট: সদর উপজেলার শালিখায় ১৪০ বোতল ফেনসিডিলসহ আটক হাফিজুর রহমান, তার স্ত্রী ও এক সহযোগী। ৪ জুলাই: মুজিবনগরের কোমরপুরে আরও একজন আটক, উদ্ধার ফেনসিডিল, নগদ টাকা ও মোবাইল। ১৯ অক্টোবর: গাংনী উপজেলায় পৃথক অভিযানে সাড়ে ৩ লাখ টাকার ভারতীয় হেরোইন ও ইয়াবা উদ্ধার করে বিজিবি কিন্তু কেউ ধরা পড়েনি। ৬ আগস্টের ঘটনাটি গোটা সীমান্তবাসীকে নাড়া দিয়েছিল। সীমান্তে বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে পানিতে ঝাঁপ দেন বাবু ওরফে মিঠু। রাতভর খোঁজার পর হরিরামপুর বিলে ভেসে ওঠে তার নিথর দেহ। স্থানীয় এক বৃদ্ধের কণ্ঠে আক্ষেপ, “এই মৃত্যু শুধু একজনের না, এই সীমান্তের করুণ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।” মাদকের ছোবলে শুধু আইনশৃঙ্খলাই নয়, ভেঙে পড়ছে পরিবারও। গাংনী উপজেলার গাড়াবাড়িয়া গ্রামের কৃষক তাজুল ইসলামের সংসার ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে তাঁর ছেলে বেল্টুর কারণে। নেশার টাকার জন্য সে প্রথমে ঘরের জিনিসপত্র বিক্রি করে, পরে চুরি শুরু করে। সম্প্রতি চাচাতো ভাইকে কুপিয়ে আহত করেছে সে। অন্যদিকে বুড়িপোতা গ্রামে শিশু-কিশোরদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে মাদকের ভয়াবহতা। অস্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মামুন জানায়, প্রতিদিন সন্ধ্যায় গ্রামের বাজারে অন্তত অর্ধশত তরুণ গাঁজা সেবন করে। ৫০০ টাকায় ১০০ গ্রাম গাঁজা কিনে কয়েকজন মিলে ভাগাভাগি করে খায়। এভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম জড়িয়ে যাচ্ছে নেশার অন্ধকারে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পাচারের পদ্ধতি তিন ধাপে পরিচালিত হয় । প্রথমে সীমান্ত পার করে একদল মাদক আনে। তারা স্থানীয় এজেন্টদের হাতে তা হস্তান্তর করে। এরপর খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে পুরো অঞ্চলে। এই চক্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে নারী ও শিশুদের। কারণ আইনে তাদের জন্য শাস্তি তুলনামূলক কম। আর এই সুযোগেই বড় মাদক ব্যবসায়ীরা থাকছে আড়ালে। স্থানীয়দের মতে, “মাদক এখন শুধু অপরাধ নয়, এটি তাদের জীবনের অভিশাপ।” জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অ্যাড. মোসতাফিজুর রহমান বলেন, “আদালতে আসা বেশির ভাগ মাদক মামলার আসামি আসলে খুচরা বহনকারী বা মাদকসেবী। বড় ব্যবসায়ীরা ধরা পড়ে না।” জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক জানান, নিয়মিত অভিযান চালানো হলেও মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না। মেহেরপুর সীমান্তের এই অন্ধকার জগত শুধু মাদক নয়, বয়ে আনছে দারিদ্র্য, সামাজিক অস্থিরতা ও সহিংসতা।

রিলেটেড পোস্ট

মতামত দিন


The reCAPTCHA verification period has expired. Please reload the page.