প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনুসের বিশেষ সহকারী (ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়) ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেছেন, বাংলাদেশে বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে সংবিধান দিয়ে নয়, বরং প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ইচ্ছায়। ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী একাধারে সংসদ নেতা, মন্ত্রিসভার প্রধান এবং কার্যত বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রের সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী হয়ে উঠেছেন। ফলে রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী অতিমাত্রায় ক্ষমতাবান হওয়ায় দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ পুলিশ ও বিচার বিভাগ কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। এর ফলে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। অকার্যকর রাষ্ট্র নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার টিকিয়ে রাখতে সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা করে। এই বিরামহীন ক্ষমতা ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের সমন্বয়েই আমাদের দেশে একের পর এক প্রধানমন্ত্রী স্বৈরাচারে রূপ নিয়েছেন।
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, স্বৈরাচারী শাসনের পরিণতিতে দেশে গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড মহামারী আকার ধারণ করেছে। এমন একটি ভয়ংকর বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী চাইলে যে কাউকে যে কোনো সময় হত্যা করার নির্দেশ দিতে পারেন—এমন ধারণা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একইভাবে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী চাইলে ফাঁসির আসামিকে মুক্তি দেওয়া থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও ইচ্ছামতো নিতে পারছেন।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো উন্নয়ন ও কল্যাণের বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিলেও রাষ্ট্রের এমন কোনো জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা নেই, যার মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায় এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না। শিক্ষা উপবৃত্তি প্রকৃত শিক্ষার্থীর হাতে পৌঁছাচ্ছে কি না, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতা সঠিকভাবে বিতরণ হচ্ছে কি না কিংবা সড়ক উন্নয়নের বরাদ্দ অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নের কোনো জবাব রাষ্ট্র দিতে পারছে না।
রাষ্ট্রকে কার্যকর ও গণতান্ত্রিক করতে প্রকৃত ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী একটি শক্তিশালী সাংবিধানিক আদালত থাকতে হবে, যা প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার বাইরে গিয়ে সংবিধানের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে। সংসদকে স্বাধীনভাবে আইন প্রণয়ন, সংশোধন ও সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষমতা দিতে হবে। বিরোধী দলসহ ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যদেরও জনস্বার্থে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার সাংবিধানিক সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, সাংবিধানিক, প্রশাসনিক ও বিচার বিভাগ—এই তিন ব্যবস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে এবং প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানকে আলাদাভাবে ক্ষমতাবান করতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন ও সরকারি কর্ম কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে সরকার ও বিরোধী দলকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সংসদের স্পিকার নির্বাচন, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে জাতীয় ঐকমত্য জরুরি।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ উল্লেখ করে তিনি সকল নাগরিককে স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
শুক্রবার বিকেলে মেহেরপুর জেলা প্রশাসনের আয়োজনে শহরের সামসুজ্জোহা পার্কে ‘আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন: দেশের চাবি আপনার হাতে’ শীর্ষক গণভোট প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন মেহেরপুর জেলা প্রশাসক ড. সৈয়দ এনামুল কবির।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ঐক্যমত) মনির হায়দার, মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. শেখ বখতিয়ার উদ্দীন, মেহেরপুরের পুলিশ সুপার উজ্জ্বল কুমার রায়, মেহেরপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. এ. কে. এম. নজরুল কবীর এবং জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এনামুল হক।
পূর্ববর্তী পোস্ট

