ঠান্ডা বাতাসে হিম হয়ে আসে চারদিক। কুয়াশা ঢেকে দেয় রাস্তা। ঠিক এমন এক সকালে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার রাজা ক্লিনিকের পাশে বসে ছোট্ট চুলায় ডিম সেদ্ধ করছিলেন বানুয়ারা খাতুন। হাত কাঁপছে, শরীর কাঁপছে, কিন্তু থেমে নেই তাঁর সংগ্রাম। জীবনের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে যেন বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন তিনি। আজকের এই অবস্থানে পৌঁছাতে তার পথটা ছিল না সহজ। ছিল গঞ্জনা, অপমান, নির্যাতন আর একা হয়ে যাওয়ার বেদনা। প্রায় ২০ বছর আগে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় বানুয়ারা খাতুনের। বিয়ের সময় যৌতুক হিসেবে বাবার কাছ থেকে নিতে হয় ১০ হাজার টাকা। প্রথম পাঁচ বছর চলে মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে। কিন্তু মায়ের মৃত্যুর পর শুরু হয় তার জীবনের টানাপড়েন। শাশুড়ি ও চার ননদের গঞ্জনা, অপমান, হেনস্তা প্রতিদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। স্বামী রাজমিস্ত্রি হলেও কখনও দাঁড়াননি স্ত্রীর পাশে। বরং চুপ করে থেকেছেন সমস্ত অবিচারের সামনে। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ছেলে-মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন বানুয়ারা। কিন্তু সেখানেই যেন অপেক্ষা করছিল আরও এক দুঃস্বপ্ন। মায়ের মৃত্যুর অল্প কিছুদিন পর নির্যাতন আর অবহেলায় সেই ঘরও হয়ে উঠল অসহনীয়। শেষ পর্যন্ত সন্তানদের নিয়ে বেরিয়ে আসতে হলো একেবারে রাস্তায়। বিয়ের পর বানুয়ারা জানতে পারেন তার স্বামীর আগেও ছিল দুটি বিয়ে। শাশুড়ি ও ননদের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আগের দুই স্ত্রীও সংসার ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। সেই একই অধ্যায় যেন পুনরাবৃত্তি হলো বানুয়ারার জীবনে। আজ তিনি গাংনী শহরের রাজাক্লিনিকের সামনে সেদ্ধ ডিম বিক্রি করেন। হাঁসের ডিম ২০ টাকা, ব্রয়লার ডিম ১০ টাকা। দিনে আয় মেলে গড়ে মাত্র দুই শ’ টাকার মতো। সেই টাকায় ঘরভাড়া, খাবার, সন্তানদের ন্যূনতম চাহিদা—সবই সামাল দিতে হয় তাঁকে। তার মুখে কেবল একটাই কথা— “কী করবো বলেন? সন্তান তো বাদ দিতে পারি না… তাই এই শীতেও ডিম বিক্রি করি। একটু যদি সাহায্য পেতাম, একটা ছোট্ট ঘর হলেও পেতাম, তাহলে বাচ্চাগুলোকে নিয়ে বাঁচতে পারতাম…।” অভাবের কারণে মেয়েকে বাল্যবিবাহ দিতে বাধ্য হয়েছেন। আর মাত্র ১৫ বছরের ছেলে সে বাবার কাছে চলে গিয়েছে। খোলা আকাশের নিচে বসে যখন তিনি ডিম বিক্রি করেন, তখন মাঝে মাঝে থেমে কেউ কেউ ডেকে বলেন,“মা, কষ্ট করেন খুব…” কারও কারও সহানুভূতির হাত একটু শক্তি যোগায় তাকে। কিন্তু স্থায়ী সমাধান এখনও নেই। কাঁপা হাতে ডিম তুলে দেন ক্রেতার হাতে, আর নিজের বুক শক্ত করেন। কারণ এখন তার স্বপ্ন খুব ছোট— একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই, আর দুই সন্তানের জন্য একটু নিরাপদ ভবিষ্যৎ। এলাকাবাসী ও সমাজের বিত্তবানদের পাশাপাশি সরকারের কাছেও তার আকুতি— “সন্তানদের নিয়ে বাঁচতে চাই… আর কিছু না, শুধু একটু মানুষের মতো বাঁচার সুযোগ চাই।” সহযোগিতা ও যোগাযোগের জন্য— ০১৭৫৯-৫৩৮২৮২ (নগদ/বিকাশ)।
পূর্ববর্তী পোস্ট

